Monday, January 2, 2023

ইষ্টার আইল্যান্ড এক অমীমাংসীত রহস্যে ঘেরা দ্বীপ || Tuber Hunt | Easter I...


পৃথিবীতে হাজারো দ্বীপ আছে যেখানে আজও মানুষের পা পড়েনি। আবার কিছু দ্বীপ আছে যেখানে হাজার হাজার বছর আগে মানুষ বসবাস করত কিন্তু আজ তা মানুষ বসবাসের অযোগ্য, তা পরিত্যক্ত। আজ আপনাদের এরকমই এক পরিত্যক্ত দ্বীপের কথা বলব যেখানে হাজার বছর আগে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত মানুষের বসবাস ছিল এবং যারা এই দ্বীপকে রক্ষা করার জন্য বানাতো বিশাল বিশাল মূর্তি। যার এক একটির উচ্চতা এখনকার যুগের দশ তালা বাড়ির সমান। কোন রকম উন্নত প্রযুক্তি ছাড়াই তারা কিভাবে এই বিশাল আকারের মূর্তি বানিয়েছিল তা আজও রহস্য। চলুন ঘুরে আসা যাক সেই রহস্যময় দ্বীপটি থেকে।  

প্রশান্ত মহা সাগরের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ হল ইস্টার আইল্যান্ড। ৬৬ বর্গমাইলের এই ছোট্ট ত্রিভুজাকৃতির দ্বীপটিতে অস্টাদশ  শতকের গোড়ায় ইউরোপীয় নাবিকরা যখন প্রথম পদার্পণ করল, তখন তারা দেখতে পেলো যে পুরো দ্বীপের সমুদ্রের ধার ঘেঁষে শত শত প্রকাণ্ড প্রস্তর মূর্তি। কে বা কারা বানিয়ে রেখেছে তা কোথাও লেখা নেই। মূর্তিগুলো ১৫ থেকে ২০ ফুট চওড়া। প্রায় দশ তালা বাড়ির সমান উঁচু এবং ওজন ১০ থেকে ২৫০ টনেরও বেশি। ইস্পাতের মত কঠিন শীলাকে কাটা হয়েছে মাখন কাটা করে। ১০ হাজার টন ওজনের সব পাথর পড়ে আছে এখানে ওখানে। তাদের আর চাঁছা ছেলা করা হয়ে ওঠেনি। 
৩৩ থেকে ৬৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা আর প্রায় ৫০ টন ভারী শত শত মূর্তি আজও চেয়ে থাকে পর্যটকদের মুখের দিকে বুক ফুলিয়ে। এই দ্বীপটির নামকরণ করেন একজন ডাচ অভিযাত্রী। ১৭২২ সালের এপ্রিল মাসে এই দ্বীপটি প্রথম গোচরে আসে এবং ওই দিন ছিল খ্রিস্টানদের পবিত্র স্টার দিবস। তাই দ্বীপটির নামকরণ করা হয় স্টার দ্বীপ। 

লক্ষাধিক বছর আগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ত্রিভুজ আকৃতির এই দ্বীপটির সৃষ্টি হয়। দ্বীপটির তিন কোনায় রয়েছে তিনটি মৃত আগ্নেয়গিরি। দ্বীপটির মোট আয়তন ১৬৩.৬ বর্গ কিলোমিটার। এই দ্বীপটি সারা দুনিয়াতে খ্যাতি লাভ করেছে তার পাথরের বিশাল আকার মূর্তিগুলোর জন্য। মূর্তিগুলোকে ডাকা হয় মুয়াই নামে এবং মূর্তিগুলোকে পাথরের তৈরি প্লাটফর্মে দাঁড় করানো হয়েছে। যেগুলোকে ডাকা হয় আহু নামে। প্রতিটি আহু এবং মুয়াই এর আবার আলাদা নাম আছে। দ্বীপ জুড়ে রয়েছে ১১৩টি আহু এদের মধ্যে ১২৫টিতে মুয়াই স্থাপন করা হয়েছে।

দ্বীপের পরিধি জুড়ে ২৫ কিলোমিটার পর পর রাখা হয়েছে আহু। আহু দ্বারা প্রায় পুরো দ্বীপটিকেই আবর্তিতি করা হয়েছে। প্রত্নতক্তবিদ ভ্যান্টিল বারগ ১৯৮৯ সালে এই দ্বীপ জুড়ে এক জরিপ চালান, তার জরিপে দ্বীপটিতে মোট ৮৮৭টি মুয়াই পাওয়া যায়। প্রাপ্ত মুয়াইয়ের মাঝে ২৮৮টিকে বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত আহুতে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। বেশিরভাগ মুয়াই যে যে খনি থেকে তৈরি করা হয়েছিল তার নাম রানু রারাকু। রানু রারাকুতে স্থানান্তরিত রুপে বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় পড়ে থাকতে পাওয়া যায়। বাকি আহুগুলো দ্বীপের অন্যান্য স্থানে পাওয়া যায়। এইগুলোর বেশিরভাগ মূর্তির মাথা পুরো মূর্তিটির পাঁচ ভাগের তিন ভাগ। সবচেয়ে বড় মুয়াই যা রানু রারাকু কারখানায় রয়ে গেছে তার নাম হলো এলজি গেন্টি। এর উচ্চতা আনুমানিক ৭১.৯৩ কিলোমিটার এবং এর ওজন আনুমানিক ১৬৫ তন। 

আহুতে দাঁড় করানো মুয়াই এর মাঝে সবচেয়ে বড়টি হলো পারু। যার উচ্চতা ৩২.৬৩ ফুট এবং আনুমানিক ওজন ৮২ টন। অবশ্য আহু হিংগাটি তিংগাতে ৩৩.১০ ফুট একটি মুয়াই স্টার বাসি নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু দাঁড় করানোর সময় এটি পড়ে যায়। সব চেয়ে ছোট মুয়াইটি আছে ইউকে। এটির উচ্ছতা ৩.৬ ফুট। ক্যাপ্টেন রগে বিন স্টার এ নেমে দ্বীপে স্থাপিত বিশাল আকার স্থাপতিগুলো দেখে অবাক হয়ে যান। কারণ তিনি দ্বীপটি প্রায় বৃক্ষ শুন্য অবস্থায় দেখতে পান। হাজার দুয়েক মানুষ এবং তাদের তৈরি একদম হালকা ধাঁচের কিছু মাছ ধরার নৌকা দেখেন তিনি। তিনি কিছুতেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না এরকম একটি অনগ্রসর দ্বীপবাসীর পক্ষে পাথর খোদাই করে কি করে এত বিশাল মূর্তি বানানো সম্ভব হয়েছিল।

স্টার বাসীর ছিল না পাথর কাটার কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি। যা দ্বারা তারা এত বিশাল পাথর খোদাই করতে পারবে। ছিল না কোন আধুনিক যান, যার দ্বারা তারা রানু রারাকু কারখানা থেকে মুয়াইগুলোকে নানা স্থানে স্থাপিত আহুতে নিয়ে যাবে বা ছিল না কোন ক্রেন যা দ্বারা তারা আহুতে মুয়াই স্থাপন করবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানোর জন্য যত মানুষ দরকার এবং খাবারের দরকার তা ছিল না স্টার দ্বীপে। ছিল না কোন বড় গাছ। তাহলে তারা কিভাবে এই মূর্তি বানালো। আর কেনইবা এত বড় মূর্তি বানালো। তাছাড়া পরিস্থিতিটা আরও রহস্যময় করেছিল সেই খানের আদি বাসিন্দারা। তাদের কথা অনুযায়ী, পাথর খোদাই করার পর পুরোহিতরা মানা নামে এক আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বলে মুয়াইকে হেটে আহুতে চলে যাবার নির্দেশ দিত এবং তারা চলেও যেত। এছাড়া দ্বীপটির প্রাচীন নাম নেবেল অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড ও আইচ লুকিং এট হেভেন। 

অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদদের অন্যরকম গবেষণায় নিয়ে যায়। তাদের মতে, দ্বীপটি  অনেক আগেই বসবাস যোগ্য ছিল এবং প্রাচীন কোন উন্নত সভ্যতা যারা পরে হারিয়ে গিয়েছিল তারা দ্বীপটিতে বসবাস করত কোনো এক সময়। এটি পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিছু সৌখিন প্রত্নতান্তিক এসব কর্মকাণ্ডকে ভিনগ্রহের বাসিন্দাদের কাজ বলে ঘোষণা দিয়ে রহস্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের কথা হলো- একদল আটকে পড়া ভিনগ্রহবাসী এসব মূর্তি বানানো শুরু করেছিল। পরে যখন তাদের উদ্ধার করতে আসা হয় তখন মূর্তি নির্মাণ অসমাপ্ত রেখেই তারা চলে যায়। দ্বীপটির প্রধান মূর্তি তৈরির কারখানা রানু রারাকুতে প্রচুর ব্যাথাল পাথরের তৈরি ছেনি বাটালী পাওয়া গিয়েছে। পাথর খোদাই করতে হলে আধুনিক যন্ত্র লাগবে এমন কিছু না। প্রাচীন সব যন্ত্রপাতি দিয়েও পাথর খোদাই করা সম্ভব। তবে দরকার ছিল প্রচুর লোক। কিন্তু এত লোক দ্বীপবাসি পেল কোথাই? 

যদিও রগে বিন যখন দ্বীপটিতে নামেন তখন খুব বেশি লোক ছিল না। সাম্প্রতিককালে গবেষণায় দেখা যায়, স্টার একসময় গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ ছিল। সেখানে ছিল প্রচুর পাখির বাস এবং তারা মাছ ধরার নৌকা চালাতে ছিলো পটু। কারণ দ্বীপের  মাটি খুঁড়ে ডলফিনের কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে। প্রতিটি মূর্তি আকারভেদে ৫০ থেকে ১৫০ জন লোক পাথর কেটে তৈরি করতে খুব বেশি দিন লাগার কথা নয়। মূর্তিগুলো পরিবহনের জন্য ওয়াজ আকৃতির স্লেজ নির্মাণ করা হয়েছিল আম গাছ দিয়ে। স্টারে থাকা আওহাও নামক এক ধরনের গাছের ছাল ব্যবহার করা হয়েছিল দড়ির কাজে। 

মুয়াইয়ের আকারভেদে ১৮০ থেকে ২৫০ মানুষকে টানতে হয়েছে স্লেজ গাড়ি। তবে সবচেয়ে বড় মুয়াই পারুকে টানতে এর পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি লোক লেগেছিল। একসঙ্গে সবাই সমান গতিতে টানলে সবচেয়ে দূরে আহুতে যেতে সর্বোচ্চ সপ্তাহখানেক সময় লেগেছিল। এর পরের বাধা হলো আহুতে মূর্তিগুলো কিভাবে স্থাপন করা হলো তা নিয়ে। এরও একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, প্রথম মুয়াইয়ের নিচের দিকটা আহুতে টেনে তোলা হয়েছিল। তারপর কাঠ দিয়ে মুয়াই এর মাথা আস্তে আস্তে উপরে উঠানো হয়। ভাসাম্য বজায় রাখার জন্য একাধিক মানুষ দড়ি ব্যবহার করত। তবে এত বিশাল মূর্তি বানানোর ক্ষেত্রে সম্ভবত প্রতিযোগী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছিল। 

স্টার দ্বীপে ১১টির মতো গোষ্ঠি ছিল। যারা হয়ত একজন আরেক জনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। মূর্তি অসমাপ্ত রাখার কারণ হল ততদিনে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাওয়া এবং এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাতে গিয়ে দ্বীপের বৃক্ষ ও খাদ্য ভান্ডার শেষ করে ফেলা। পরিবেশের বিপর্যয় হওয়ায় স্টার দ্বীপে খাদ্যের অভাব দেখা দিল। সম্পদের অপচয় পুরোদমে চালু ছিল কিন্তু সে প্রাকৃতিক সম্পদ নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছিল না। ফলে জনসংখ্যা সাংঘাতিক রকম কমে আসে। এভাবে দ্বীপটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। 



No comments:

Post a Comment